নলেন গুড়ের সীতাভোগ-মিহিদানা

মিষ্টিপ্রেমী বাঙালি। সীতাভোগ, মিহিদানার নাম জানেন না এমন কেউ আছেন কি না সন্দেহ। বর্ধমানের সঙ্গে যে দুটি শব্দ সমার্থক, তা হল সীতাভোগ ও মিহিদানা। ঝকঝকে সাদা রঙের সীতাভোগ আর হলুদ রঙের মিহিদানার প্রেমে পড়েননি, এমন মিষ্টিপ্রেমী বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। জানেন কি? জন্মের ১১৫ বছর পরে বর্ধমানের সীতাভোগ ও মিহিদানার স্বাদ বদলে গেল! কিভাবে? কেন? উত্তর থাকছে এই প্রতিবেদনে।

সীতাভোগ ও মিহিদানার জন্ম বর্ধমানে। ইতিহাস খুঁজলে জানা যায় এদের জন্মকাহিনী। বর্ধমানের রাজা বিজয়চাঁদ মহাতাবের আমন্ত্রণে ১৯০৪ সালের আগস্ট মাসে হাইকোর্টের বিচারপতি সহ আরও অন্যান্য অতিথি-অভ্যাগতদের নিয়ে বড়লাট লর্ড কার্জন বর্ধমান সফরে আসেন। এই উপলক্ষ্যে বর্ধমানের রাজপ্রাসাদে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ভোজসভা বসে গোলাপবাগে। বাংলার তৎকালীন বড়লাটকে খুশি করার জন্য বর্ধমানের রাজা বিজয়চাঁদ মহতাব দুটি বিশেষ মিষ্টি প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন শহরের প্রখ্যাত মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক ভৈরবচন্দ্র নাগকে। সেই ভৈরবচন্দ্রেরই আবিস্কার, মিহিদানা ও সীতাভোগ। রসে ভেজা অথচ ঝরঝরে মিহি আকারের দুই মিষ্টান্ন খেয়ে খুশী হন বড়লাট। ভৈরববাবুকে পুরস্কার ও সার্টিফিকেট দিয়ে যান বড়লাট। স্বাধীনতার পরে দেশের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু, লালবাহাদুর শাস্ত্রীও খেয়েছিলেন সীতাভোগ ও মিহিদানা।

কিভাবে প্রস্তুত হয় মিহিদানা? মিহিদানার প্রধান উপাদান চাল। সাধারণত গোবিন্দভোগ, কামিনীভোগ বা বাসমতী চাল ব্যবহার করা হয়। চাল গুঁড়ো করে তার সঙ্গে বেসন ও জাফরান মেশাতে হয়। তারপর জল মিশিয়ে হালকা হলদে রঙের থকথকে মিশ্রণ তৈরী করা হয়। এবার একটি ছিদ্রযুক্ত পেতলের পাত্র থেকে ওই মিশ্রণ কড়াইতে ফুটন্ত গাওয়া ঘিতে ফেলা হয়। দানাগুলি কড়া করে ভেজে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তুলে চিনির রসে রাখা হয়।

সীতাভোগের প্রধান উপাদান সীতাশাল প্রজাতির গোবিন্দভোগ চাল। বিশেষ প্রজাতির চাল থেকে প্রস্তুত হওয়ার জন্যই সীতাভোগের নিজস্ব স্বাদ ও সুগন্ধ রয়েছে। চাল গুঁড়ো করে তাতে ১:৪ অনুপাতে ছানা মিশিয়ে পরিমাণমত দুধ দিয়ে মাখা হয়। তারপর একটি বাসমতী চালের আকৃতির মত ছিদ্রযুক্ত পিতলের পাত্র থেকে ওই মিশ্রণকে গরম চিনির রসে ফেলা হয়। সীতাভোগ লম্বা ভাতের মত দেখতে হয়। এর সঙ্গে কাজুবাদাম ও কিশমিশ মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়।

সীতাভোগ ও মিহিদানার পেটেন্ট আইনিভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পেয়েছে। দমদম বিমানবন্দরে বিশ্ব বাংলা শো-রুমে পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে সীতাভোগ আর মিহিদানাকে তুলে ধরা হয়েছে। অতীত গৌরব এখনও অটুট এই দুই মিস্টির। তবে অনেকেই মনে করেন, সীতাভোগ ও মিহিদানার গুণমান আর আগের মতো নেই। কারণ, বাজারে সেই মানের ছানা, গাওয়া ঘি, বেসন, চালের গুড়ো কিছুই মেলে না। বহু দোকানে গাওয়া ঘিয়ের বদলে রিফাইন ঘি দিয়ে সীতাভোগ-মিহিদানা তৈরি করা হয়। মিলছে না সীতাশাল চালও। তাই আতপ চাল দিয়ে বানাতে হচ্ছে সীতাভোগ। আবার দক্ষ কারিগরেরও অভাব রয়েছে।

গত ১১৫ বছর ধরে মোটামুটি একই স্বাদ ধরে রেখেছিল সীতাভোগ ও মিহিদানা। ২০২০ সালে এসে প্রথমবার তাদের স্বাদ বদলে গেল। চিনির রসের জায়গা নিল নলেন গুড়। সীতাভোগ ও মিহিদানার সঙ্গে বর্ধমানের প্রসেনজিৎ দত্তের নাম জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরেই। তাঁর হাত ধরেই স্বাদ বদল হল মিষ্টি দুটির। সেজন্য নদীয়া জেলা থেকে খাঁটি নলেন গুড় নিয়ে আসেন তিনি। ইতিমধ্যেই সীতাভোগ, মিহিদানার নতুন স্বাদ পছন্দ হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এখন থেকে প্রতিবছর শীতে নলেন গুড়ের সীতাভোগ ও মিহিদানা মিলবে তাঁর দোকানে।

তাই এখন থেকে শীতে বর্ধমান গেলে একবার প্রসেনজিৎবাবুর দোকানে ঢুঁ মারতে ভুলবেন না। স্টেশনে হোক, মিউনিসিপ্যালিটির কাছে হোক বা রানীগঞ্জ বাজারে, তিন জায়গাতেই দোকান রয়েছে তাঁর। সীতাভোগ ও মিহিদানার চিরাচরিত স্বাদ নলেন গুড়ের সান্নিধ্যে এসে কতটা মোহনীয় হয়ে উঠেছে তা পরখ করে দেখে নেবেন।   

aamarvlog

শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। আমার ব্লগ- হাবি জাবি নয়। যোগাযোগ- ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ- 9434312482 ই-মেইল- [email protected]

Feedback is highly appreciated...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: