কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের সঙ্গে কাঁকসার শ্যামারূপা মন্দিরের যোগসূত্রটা জানেন কী?

পশ্চিম বর্ধমান জেলায় আসানসোল পেরিয়ে মাইথনের কাছে কল্যাণেশ্বরী মন্দির। অন্যদিকে কাঁকসার দেউলের জঙ্গলের মাঝে শ্যামারূপা মন্দির। মাঝে বিস্তীর্ণ দূরত্ব। অথচ দুই মন্দিরের মধ্যে বিশেষ একটি যোগ রয়েছে। সেটা কী জানেন? দুপুর ১২ টার মধ্যে শ্যামারূপা মন্দিরে ভোগ নিবেদন সম্পন্ন করতে হয় কারণ, কল্যাণেশ্বরী মন্দিরে ভোগ প্রদান করতে হয় দুপুর ১২টার পরে।

কল্যাণেশ্বরী মন্দির ঘিরে রয়েছে নানান লোকগাথা। ঢুকতেই প্রাচীন বটগাছ যার তলায় মা শীতলার পুজো হয়। সেখানে মানুষ তাদের ইচ্ছে পূরণের জন্য পাথর বেঁধে আসে। মন্দিরের চাতাল পেরিয়ে গর্ভগৃহ। সেখানে পূজিত হয় একটি পাথরের ঢিবি। সিঁদুর, ফুল, চন্দন, লাল কাপড় দিয়ে সাজানো মা কল্যাণেশ্বরীর মূর্তি।বলা হয়, এই মূর্তিটি আসলে একটি গুহার বাইরের অংশ। দেওয়ালের ভিতরে গুহার মধ্যে আছে অষ্টধাতুর আসল দেবীমূর্তি। বলা হয়ে থাকে এই দেবীমূর্তি আসলে ইচ্ছাই ঘোষের পূজিত দেবী চন্ডী। শ্যামারূপা মন্দিরের সঙ্গে এই দেবীমূর্তির একটা সম্পর্ক আছে। সেই কারণে শ্যামারূপা মন্দিরে সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পুজো হয়। আর, দুপুর ১২ টার পর ভোগ দেওয়া হয় কল্যাণেশ্বরী মন্দিরে।

জনশ্রুতি আছে, এই ফাঁকা এলাকায় মা কল্যাণেশ্বরী যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন এখানে জনবসতি ছিল না। পরবর্তীতে জনবসতি গড়ে উঠলে মা কল্যাণেশ্বরী গুহার আড়ালে চলে যান। কল্যাণেশ্বরী মন্দির নিয়ে নানান কথা প্রচলিত আছে। একটি সূত্রে জানা যায়, ইচ্ছাই ঘোষের আরাধ্য দেবী ছিলেন দুটি মা চন্ডীর মূর্তি। একটি সোনার, অন্যটি অষ্টধাতুর। মা দূর্গার আর্শীবাদে ইছাই ঘোষের জন্ম হয়েছিল। সেই কারণে তিনি ছিলেন মা চণ্ডীর ভক্ত। এই ইচ্ছাই ঘোষ পরবর্তীকালে গড় জঙ্গলের রাজা হন।

গড় জঙ্গলে একটি দেবী চণ্ডীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন ইছাই ঘোষ। তিনি তাঁর গড় তৈরি করেন। শোনা যায় পুজোর দিনে ইচ্ছাই ঘোষ নিহত হওয়ায় মন্দিরের পুরোহিত দুঃখে ক্ষোভে স্বর্ণমূর্তিটি পাশের সায়রে ফেলে দেন। উদ্ধার করেন ইচ্ছাই ঘোষের পালিতা কন্যা। যার বিয়ে হয়েছিল পাঞ্চেতের মহারাজা কল্যাণ সিংয়ের সঙ্গে। বাবার মৃত্যুসংবাদ পেতেই তিনি ইচ্ছাই ঘোষের বাড়িতে পৌঁছান। মূর্তিটি উদ্ধার করে ঘোড়ার চাপিয়ে মূর্তিটি নিয়ে য্ওায়া হচ্ছিল কাশীপুরে। পথে ঘটল বিপদ। নদী পাড় হাওয়ার সময় মূর্তিটি হাত থেকে পড়ে যায় জলে। অনেক খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায় না।

এদিকে সন্ধ্যা নামলে নদীর পাশেই তাঁরা রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় কল্যাণ সিং এবং তাঁর স্ত্রী তথা ইছাই ঘোষের কন্যা দেবী চণ্ডীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁদের স্বপ্নে আদেশ দেন, এই মূর্তি এই নদীর পাশেই প্রতিষ্ঠা করতে। মানুষের মঙ্গলার্থে তিনি মা কল্যাণেশ্বরী নামে পুজো নেবেন। প্রত্যেকদিন সকাল থেকে বেলা ১২ টা পর্যন্ত গড় জঙ্গলে ভোগ গ্রহণ করবেন। তারপর এখানে পুজো নেবেন।

সেই স্বপ্নাদেশ অনুসারে রাজা কল্যাণ সিং হ্যাংলা পাহাড়ে (অতীতে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের নাম ছিল) মন্দির তৈরি করে মূর্তি সেখানে প্রতিষ্ঠা করলেন। তখন থেকে মা চন্ডী কল্যাণেশ্বরী নামে পূজিত হন। আজও শ্যামারূপা মন্দিরে ভোগ দেওয়া বেলা ১২ টার আগে। তার পরে কল্যাণেশ্বরী মন্দিরে ভোগ দেওয়া হয়। এখানে একসময় নরবলি হতো, এমনটাও শোনা যায়। মন্দির চত্বরে গেলে গা কেমন ছমছম করে ওঠে ইতিহাসের কথা মনে করলে।

আরেক সূত্রে জানা যায়, কোনও ভক্তদাস নামে ব্রাহ্মণের সন্তানের মেয়ে ভবানীকে হরণ করেছিলেন মা কল্যাণেশ্বরী। সেই ভক্তদাসের কাছে ভবানীরূপে দেবী আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁকে বলেন, আমি নিজের মাহাত্ম্য প্রচার করার জন্য তোর মেয়েকে হরণ করেছি। তাই আজ থেকে আমি আর মুখ দেখাবো না। পিছন ফিরে থাকব। দক্ষিণ মুখে পুজো করলে আমি পুজো গ্রহণ করব। সিঁদুর, ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজো করার নির্দেশ দেন দেবী। (বিশেষ বিশেষ ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করে আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটিও সাবস্ক্রাইব করুন।)

 

aamarvlog

শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। আমার ব্লগ- হাবি জাবি নয়। যোগাযোগ- ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ- 9434312482 ই-মেইল- [email protected]

Feedback is highly appreciated...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: