নিজেকে সামলে রাখুন, করোনার আঁতুরঘরে যাবেন না

দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে স্বঘোষিত লকডাউন হোক। সম্পাদকের কলমে অর্পিতা মজুমদার।

বাংলা তথা আপামর বাঙালির আবেগ দুর্গাপুজা। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে জড়িয়ে পড়েন বহুমানুষ। বাংলা কেন, দেশে বিদেশে যেখানে যেখানে বাঙালি আছে সেখানেই দুর্গাপুজা হয়। থিম পুজোর হাত ধরে প্রায় ৬ মাস আগে থেকে বড় বাজেটের পুজোগুলোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। খুঁটি পুজো থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে নানান পেশার মানুষ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে উপার্জন করে থাকেন। সংসার চলে তাঁদের।

এবছরটা একেবারে আলাদা। করোনা নামক অতিমারি মানুষকে কঠিন বাস্তবের মুখে দাঁড় করিয়েছে। স্বাধীনতার পর প্রথম বার এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন এক শত্রুর হাতে পড়েছেন দেশের মানুষ-যাকে প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, সে যে কোন পথে আক্রমণ করছে সেটাই নিশ্চিত করতে পারছেন না।

স্বাধীনতার পর নানান গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রে ও রাজ্যে থাকা সরকার। স্বাধীনতার পর কৃষকদের সুরক্ষার দিক দেখা হয়েছিল যার ফল স্বরূপ খাদ্য শস্যের চাহিদা মিটিয়ে বাইরের দেশেও খাদ্য শস্য রফতানি করা যাচ্ছে। অন্য দিকে বন্যা ছিল এই নদীমাতৃক দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। নদীগুলিকে বাঁধ দিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি জল বিদ্যুৎ তৈরী করা, চাষের কাজে সেচ এমনকি পানীয় জলের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। সরকারি নানান দফতর, স্কুল-কলেজ সহ নানান জায়গায় মানুষের কাজের সংস্থান করা হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাবা তার মেয়ের বিয়েতে সামান্য খরচাই করতে পারতেন। কারণ প্রধানত ২ টি। এক, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ১০-১২ ভাই বোন থাকাটা কোনও হাসির বিষয় ছিল না। সরকারের “হাম দো হামারে দো” এই শ্লাগানে সাড়া দিয়ে জনসংখ্যার হারকেও নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। এখন ‘হাম দো হামারে এক’ এই ভাবনাতেই বেশিরভাগ বাঙালি বিশ্বাস করেন।

বাজার অর্থনীতি ভারতবর্ষের অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে দুই দশক আগে। এই অর্থনীতির হাত ধরে বেসরকারি চাকরির সুযোগ বেড়েছে। দেশি-বিদেশি কোম্পানিতে মোটা মাইনের চাকরির সঙ্গে বেড়েছে কম মাইনের চাকরিও। ফলে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের চাকরির প্রতি ঝোঁক বেশি। ফলে নানান বেসরকারি কলেজ তৈরী হয়েছে। গ্রামগুলি হয়ে পড়েছে নতুন প্রজন্ম শূন্য। আরও ভালো থাকার সন্ধানে চাষের প্রতি অনীহা তৈরী হয়েছে। তারা পাড়ি দিচ্ছে অন্য রাজ্যে। ভালোই চলছিল সব কিছু। কিন্তু করোনা কোথায় যেন সব হেলিয়ে দিয়ে গেল। ব্যালেন্স হারিয়ে মানুষ যেন যোগ গুরু রামদেবের মতোই হাতির পিঠ থেকে সটান পড়ল মাটিতে। লাগেনি ঠিক কথা। কিন্তু এটা তো বোঝা গেল যে ভাবনা আর বাস্তব এক নয়। বাস্তব বেশ কঠিন।

করোনা পরিস্থিতিতে গোটা বিশ্বে বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমার দেশের কথায় আসি। এই দুঃসময়ে বেসরকারি সংস্থাগুলি তাদের নিয়মেই হাত তুলে নিয়েছে। ফলে তার জল গড়িয়েছে, বড় শহরে খেটে খাওয়া মানুষ গুলির রান্নাঘর পর্যন্ত। তারা নিজের গ্রামে ফিরছে। কিন্তু কি নামে? পরিয়ায়ী! ভাবা যায়, ভালো থাকার সন্ধানে গিয়ে নিজের দেশে তাদের পরিচয় এখন “পরিযায়ী”।

যা হোক এবার পুজোর কথায় ফিরি। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা হুল্লোড় করতে জানে। তাদের পাতে স্থান করে নেয় বার্গার, পিৎজা বা ম্যাগি। তা সে কোটিপতি ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়ে হোক বা সবজি বিক্রেতার ছেলেমেয়ে (কাউকে অসম্মান না করে)। তাদের বাবা মা যা পায়নি, সব বাবা মা ছেলেমেয়েদের সবটা দিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চাইছেন। এটা ঠিক, তাঁরা করছেন না, করছে এই গ্লোবাল অর্থনীতি।

সে যা হোক। আমার বিষয়, দুর্গাপুজোর চারটি দিন। গত বছর পর্যন্ত অনেকেরই পাঁচ দিনে ১০ টা পোষাক। জুতো নিদেন পক্ষে দু-জোড়া তো হয়েছেই। কারও কারও তো জামার সঙ্গে মিলিয়ে জুতোও হয়েছে। 

এবারের দৃশ্যটা অন্য। অন্যবার পুজোর তিন মাস আগে থেকে ব্যবসায়ীরা যেমন পসরা সাজিয়ে বসেন, তেমনই পুজোর ভীড় এড়াতে অনেকে আগে ভাগে বাজার সেরে নেন অনেকে। এবার অনেকটা পরে ঘোষণা হয়েছে পুজো হবে। আর সেই খবর পেয়েই পিল পিল করে সবাই ছুটেছেন জুতো জামা কিনতে। এত ভীড় যে চলাচল করা দায়।

করোনা কিভাবে ছড়ায় এটা এখনও সঠিকভাবে জানা না গেলেও এটা জানা গেছে, ভীড় আর বদ্ধ জায়গাই এই অতিমারির আতুর ঘর। সরকারি মৃত্যুর সংখ্যাটা সাধারণ মানুষের কাছে সেভাবে পৌঁছাচ্ছে না- আতঙ্ক ছড়াবে বলে। বেসরকারি হিসাবে দিনে আমাদের রাজ্যেই হাজার মানুষের বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। তথাকথিত সমাজের উঁচু তলার শিক্ষিত মানুষের একাংশও এই জোয়ারে গা ভাসিয়েছেন। বিউটি পার্লার থেকে শপিং মল, সাবেক দোকান সব জায়গায় ঠাসা ভীড়। বহু মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছেন। ডাক্তারবাবুরা বারবার বলছেন। কেউ শুনছে কি? জানি না এর ফল কি হবে। যাঁদের জন্য লেখা হচ্ছে তাঁরা পড়বেন কি না?

জানি পুজোর আনন্দ ভুলে থাকা খুব কঠিন। কিন্তু আনন্দে থাকতে সাজ গোজ করে বাড়িতে বসেই ঠাকুর দেখুন টিভিতে। মোবাইলে পুজো দেখুন। সিনেমা দেখুন, বই পড়ুন। বলবেন, এগুলোই তো করছিলাম সেই মার্চ মাস থেকে। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, এগুলোই করবেন। নইলে যে আমাদের হাতে কোনও অপশন-ও তো নেই।

তবে এটা ঠিক স্বাধীনতার পর প্রথমবার আমাদের ভারতবর্ষ বড় সমস্যার মুখে পড়তে চলেছে। এই খেসারত দিতে হবে আগামী বছর। যা করবেন ভেবে করুন। এমন কিছু করবেন না যে, সামনের বছর আপনার হটকারি সিদ্ধান্তই পুজোর থিম না হয়ে ওঠে!

aamarvlog

শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। আমার ব্লগ- হাবি জাবি নয়। যোগাযোগ- ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ- 9434312482 ই-মেইল- [email protected]

Feedback is highly appreciated...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: