লকডাউনের অবসাদ কাটাতে একদিনের জন্য ঘুরে আসুন ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মন্দিরে

ঘরের পাশেই একটা বেড়ানোর জায়গা রয়েছে। আবার ভক্তরা তীর্থস্থানও বলতে পারেন। তবে একবার গেলে মনে ভরে যাবে, এটুকু বলতে পারি।

যোগাদ্যা মন্দির

বর্ধমান-কাটোয়া ট্রেন রুটে ছোট্ট স্টেশন কৈচর। আবার বাসেও যাওয়া যায় কৈচর। সেখান থেকে ভ্যানোয় চেপে ৩ কিমি এগোতেই পৌঁছে যাবেন পূর্ব বর্ধমানের ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মন্দির চত্বরে। এখন অবশ্য বাসে-ট্রেনে যাওয়া সম্ভব হবে না। এখন গেলে সোজা যেতে হবে গাড়ি করে।

মন্দিরের পাশেই বিশাল লম্বা ৩৩ বিঘা আয়তনের এক দীঘি। সেই দীঘির জলের তলায় সারা বছর শুয়ে থাকেন দেবী যোগাদ্যার কষ্টি পাথরের মূর্তি। শুধু বৈশাখ মাসের শেষ দিনে মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য জল থেকে তোলা হয় মূর্তিটিকে। সেদিন দর্শণার্থীরা ভিড় করেন মন্দিরে। এছাড়া বছরের আরও ৫ দিন মূর্তিটিকে জল থেকে তুলে পুজো করা হয়। উপরে তোলার পরেও জল ঢালা হয় মূর্তিতে। মনে করা হয়, শুকিয়ে গেলে মূর্তি ফেটে যেতে পারে।

ক্ষীরদিঘীর জলে বিশালাকৃতি মাছ

৫১ সতীপীঠের অন্যতম হল ক্ষীরগ্রাম। কথিত আছে, এখানে সতীর ডান পায়ের বুড়ো আঙুল পড়েছিল। বর্ধমানের মহারাজা কীর্তি চন্দ এই গ্রামে যোগাদ্যার একটি মন্দির নির্মাণ করেন। যোগাদ্যার প্রাচীন মূর্তি কোনও ভাবে হারিয়ে গেলে সম্ভবত তাঁরই আদেশে দাঁইহাটের প্রস্তর শিল্পী নবীনচন্দ্র ভাস্কর একটি দশভুজা মহিষমর্দিনী মূর্তি গড়েন। জলের গভীরে মূর্তিটিকে রাখার পরে যাতে উপর থেকে বোঝা যায়, সেজন্য সেখানে একটি পতাকা লাগিয়ে রাখা হত। কিন্তু দুষ্কৃতীরা তিন বার মূর্তিটিকে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তারপর জলের ভিতরেই শ্বেত পাথরের মন্দির গড়ে জলের তলায় মূর্তিকে রেখে মন্দির তালাবন্ধ করে রাখা হয়।

তবে পাশেই দীঘি লাগোয়া আর এক মন্দির রয়েছে। সেখানে রাখা আছে যোগাদ্যাদেবীর প্রতিরূপ কষ্টি পাথরের প্রাচীন দশভুজা দেবীমূর্তি। মূর্তির বাঁ পা মহিষের উপর, ডান পা সিংহের উপরে রাখা। কয়েক বছর আগে দীঘি সংস্কার করার সময় জলের তলা থেকে এই মূর্তিটি উদ্ধার হয়। তারপর মন্দিরে স্থাপন করা হয়। এই মন্দির নির্মাণের সময় বাসিন্দারা মাথায় রাখেন, যোগাদ্যার আসল মূর্তি শুকিয়ে গেলে ফেটে যায়। সেজন্য এই মূর্তিটির উপর থেকে ফোয়ারা তৈরি করে জল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে জানিয়ে দেন, এই মূর্তিটি মূল মূর্তির চেয়ে অনেক পুরনো এবং অন্য ধরণের পাথর দিয়ে গড়া। তাই ফোয়ারা বদলে মূর্তির মাথার উপর রূপোর ছাতা ঝুলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

যোগাদ্যা মন্দির চত্বর

মন্দিরের রেলিংয়ে ভর দিয়ে দীঘির জলে বিশাল বিশাল মাছেদের খাবার দেওয়ার আনন্দই আলাদা। ভিড় করে আসে বড় বড় রুই-কাতলার দল। বিশাল দীঘি চারদিক পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পাড়ে বিভিন্ন রকম ফলের গাছ। বাগানের ভিতরে বসে মুড়ি আর তেলেভাজা খেতে খেতে আড্ডা দেওয়ার মজাই আলাদা। এরপর যেতে পারেন গ্রামের ভিতরের কয়েকশো বছরের পুরনো যোগাদ্যা মন্দিরে। তোরণদ্বারের প্রাচীন স্থাপত্য দেখার মতো। মন্দিরের ভিতরে রয়েছে সুড়ঙ্গ। ভক্তদের বিশ্বাস,দীঘির জল থেকে দেবী রাতে সুড়ঙ্গ দিয়ে মন্দিরে আসেন। মন্দিরের ভিতরে রাখা বিছানায় দেবী এসে বিশ্রাম নেন। এছাড়া ক্ষীরকন্টক শিবের মন্দিরও দেখার মতো।

গ্রামের ভিতর পরিদর্শন করা হয়ে গেলে চলে যেতে পারেন গ্রামের বাইরে কিছুটা দূরের বিশাল ধামাচে দীঘিতে। আয়তনে প্রায় তিনশো বিঘা। দীঘিতে মাছ চাষ হয়। একপাড় থেকে অন্যপাড়ে কি আছে নজরে আসে না। যাতায়াতের জন্য নৌকা আছে। শীতে ভিড় জমায় হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির দল। পাড়ে বিঘার পর বিঘা জমিতে নানা ফলের গাছ, সবজি বাগান। অনেকেই শীতকালে পিকনিক করতে আসেন এখানে। কথিত আছে, এই দীঘির ঘাটেই এক শাঁখারির কাছে যুবতীর বেশ ধরে শাঁখা পরেছিলেন দেবী যোগাদ্যা।

এবার ভাবছেন তো, প্রত্যন্ত ওই গ্রামে গিয়ে দুপুরে খাবেন কি? হোটেলের তো বালাই নেই। চিন্তা করবেন না। সকালে গিয়ে প্রথমে মন্দির থেকে ৩০ টাকার কুপন কেটে নেবেন। তাহলে দুপুরে পেটভরে নিরামিষ আহার মিলবে মন্দির চত্বরেই। তবে আমিষ আহার খেতে চাইলে আগাম জানিয়ে রাখতে পারেন গ্রামের ভিতরে পুরনো মন্দিরে। সেখানে আমিষ আহারের ব্যবস্থা আছে। মন্দির কর্তৃপক্ষ যাত্রীনিবাস গড়ে তুলেছেন। রাতে যদি কেউ থাকতে চান, তাঁরা থাকতে পারেন সেখানে।

aamarvlog

শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। আমার ব্লগ- হাবি জাবি নয়। যোগাযোগ- ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ- 9434312482 ই-মেইল- [email protected]

Feedback is highly appreciated...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: