ছোটগল্প- ঋত্বিক

অর্পিতা মজুমদার

এবছর কার্তিক মাসে লক্ষ্মী পুজো। শিলিগুড়ির বাতাসে হাল্কা হিমের পরশ। কাল কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। করোনা আবহে অন্যবারের মত জাঁকজমক হবে না অভিরূপার বাড়িতে। কিন্তু পুজোটা হবে পাঁচালী পড়েই। পুরোহিত ছাড়া। অনেকেই লক্ষ্মীপুজো নিজেরাই করে, এই বলে বার বার নিজেকে বুঝিয়েছে রূপা।

দীর্ঘ ৩২ বছরের সংসারে এক-আধ বার অশৌচের কারণে পুজো বন্ধ থেকেছে ঠিকই, তা বলে পুরোহিত বিনা পুজো হয়নি। তাই মনকে নানান অজুহাতে প্রস্তুত করছে। আগের দিন নিজেই ফলের বাজার করে গুছিয়ে রেখেছে। নারকেল কুড়িয়ে রেখেছে। নাড়ু বানাবে।

মোবাইল বেজে উঠেছে- ‘তুমি কি আর আগের মতই আছো নাকি অনেকখানি বদলে গেছো’।তড়িঘড়ি এসে ফোনটা রিসিভ করল রূপা। হ্যালো। অন্য অন্য প্রান্ত থেকে উত্তর এলো- চিনতে পারছো? অভিরূপার বুকের ভিতর বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল সেই চেনা স্বরে। যেন হঠাৎ করে দমকা হাওয়া ওলোট পালট করে দিতে চাইছে চারপাশ।

সমস্ত উন্মাদনা চেপে খুব শান্ত স্বরে বছর ৫২ র অভিরূপা উত্তর দিল- কে বলছেন?অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এল- আমি বলছি।

রূপা- কে বুঝলাম না! একটু পরিচয়টা বলবেন।

অন্যপ্রান্ত থেকে- রূপা আমি তোমার অতনু বলছি।

রূপা স্বাভাবিক স্বরে বলল, ও আচ্ছা। বলো কি বলছিলে? কেমন আছো? এত দিন পরে হঠাৎ?

অতনু- আমি ফিরতে চাই রূপা। অনেক হল। রণিত আর তোমার সঙ্গে আবার একসঙ্গে শুরু করতে চাই রূপা।

রূপা এক্কেবারে চুপ।

অতনু- কি গো কিছু বললে না যে! একলা থাকার নেশা, অজানা পথে একলা হাঁটা- তোমাদের থেকে আমাকে দূরে নিয়ে গিয়েছিল সেই একাকীত্ব আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আমি তোমার কাছে ফিরতে চাই। কাল তোমার লক্ষ্মী পুজো। আমি কালই বাড়ি ফিরব রূপা।

রূপা- রণিত বিদেশে সেটেলড। আমি খুব ভালো আছি অতনু। তুমি অন্য কিছু ভাবো। তোমার ভাবনাকে সমর্থন আমি করতে পারছি না। ভালো থেকো। ফোন কেটে দিল রূপা।

কড়াইয়ে নাড়কেল গুড়ে পাক দিতে দিতে অতীতের সমস্ত স্মৃতি যেন থরে থরে ধরা দিচ্ছে অভিরূপার। তখন কতই বা বয়স হবে অভিরূপার-১৩ কি ১৪। পাশের পাড়ার অতনু রায়, রূপার মামাতো দাদার বন্ধু। ওদের বাড়িতে এল লক্ষ্মী পুজোর প্রসাদ খেতে। সেদিন হলুদ পাঞ্জাবীতে বেশ মানিয়ে ছিল অতনুকে। চোখাচোখিও হয়েছে বেশ কয়েবার। কালীপুজোর আগেই একটি চিরকুট পেল হাতে। প্রেমপত্র। সেই ধুকপুকুনি, সেই অস্থিরতা আজও মনে আছে রূপার।

নাড়ুতে পাক ভালোই হয়েছে। নাড়ু তৈরী করতে করতে আবার স্মৃতিতে ডুব। রূপা যখন ইংরেজী অর্নাসের ফাইনাল দেবে সে বছরই অতনু চাকরি নিয়ে উত্তরবঙ্গে এল। পরের বছর ওদের বিয়ে। তারপর দু-বছর পর রণিত। তারও ১৫ বছর পর ঘর ছাড়ল অতনু। একটু একা থাকার নেশায়। কত কাঠ খড় পুড়িয়ে রণিতকে বড় করেছে। পড়ার খরচা যুগিয়েছে স্কুল শিক্ষিকার কাজ নিয়ে। বড় করা, নানান লোকের কথায় কান না দিয়ে সিঙ্গল মাদার। রণিতকে বিয়ে দিয়েছে। শিলিগুড়িতে দু-কামরার ফ্ল্যাট মাকে কিনে দিয়েছে। নিয়ম করে খোঁজ নেয় রণিত মায়ের। অভিরুপা এতেই খুশি। স্কুলের বাচ্চাদের সঙ্গে বেশীর ভাগ সময় কাটায়। লতানে গাছ থেকে কখন বৃক্ষে পরিণত হয়েছে সে, নিজেই জানে না।

কাল আবারও একটা লক্ষ্মী পুজো। অতনু ফিরে আসতে চাইছে। কোন রকম ভাবনা চিন্তা না করেই “না” বলে দিয়েছে সে।

এবার লক্ষ্মী পুজোয় পুরোহিত না এলেও চলবে। জীবনের বহু পুজো পুরোহিত ছাড়াই যে হয়ে যায়!…

https://durgapur24x7.com/ghost-story-by-arpita-majumder/

aamarvlog

শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। আমার ব্লগ- হাবি জাবি নয়। যোগাযোগ- ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ- 9434312482 ই-মেইল- [email protected]

Feedback is highly appreciated...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: