করোনা তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ!

করোনা তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? নানা মুনির নানা মত। বিতর্কের শেষ নেই। চলছে দোষারোপ আর পাল্টা দোষারোপ।

চিনের উহান থেকে নোভেল করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ে দেশে-বিদেশে। প্রথমে ধারণা করা হয়, সেখানেই করোনাভাইরাসের উৎপত্তি। এখানকার একটি সি-ফুড মার্কেট থেকে ভাইরাসটি প্রথম ছড়ায় বলে মনে করা হয়। গবেষকদের অনেকেরই মত, সম্ভবত এই ভাইরাসটি সাপ থেকে এসেছে। জার্নাল অব মেডিকেল ভাইরোলজিতে একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, সাপের জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, সাপের মধ্যেই করোনাভাইরাসটি থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। প্রকৃতিতে অন্তত দু’হাজার রকমের করোনা ভাইরাস রয়েছে। মানুষকে যে ভাইরাস আক্রমণ করে, তা সাপকে কখনও আক্রমণ করতে পারে না। আবার সাপকে যে করোনা ভাইরাস আক্রমণ করে সে মানুষকে আক্রমণ করতে পারে না। তাহলে সাপের করোনা ভাইরাস মানুষের শরীরে এসে জাঁকিয়ে বসে মৃত্যুর কারণ হল কি করে? বিজ্ঞানীদের মতে, সাপের মাংস খেতে খেতে কোনওভাবে সাপের করোনা ভাইরাস ও মানুষের করোনা ভাইরাসের মধ্যে জিনোম এক্সচেঞ্জ হয়েছে। এর ফলে সাপের ভাইরাস মানুষকে আক্রমণ করার ক্ষমতা পেয়েছে। এবং যেহেতু অতীতে এমন হজবরল করোনা ভাইরাসের অস্তিত্বই ছিল না, তাই ওষুধ বা টিকাও নেই। আর এর ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা অনেক বেশি হওয়ায় দ্রুত আতঙ্কিত করে তুলেছে সারা বিশ্বকে। যদিও বহু গবেষকদের আবার দাবি, সাপ থেকেই মানুষের শরীরে নভেল করোনা ভাইরাস ঢুকেছে কি না তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

কিছুদিনের মধ্যেই আমেরিকার এক আইনজীবি ও অধ্যাপক ফ্রান্সিস বয়েল দাবি করেন, কানাডার ল্যাবোরেটরি থেকে করোনা ভাইরাস চুরি করে তার জিনের বদল ঘটিয়েছে উহানের বায়োসেফটি ল্যাব। এরপরেই এমন প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে নোভেল করোনাভাইরাস। তাঁর মতে, উহানের ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির বায়োসেফটি লেভেল ফোর ল্যাবে অতি গোপনে রাসায়নিক মারণাস্ত্র বানানোর গবেষণা চলছে। সেখান থেকেই ছড়িয়েছে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। সি-ফুড মার্কেটের সঙ্গে এর কোনও যোগ নেই। চিন ইচ্ছাকৃতভাবে এ’কথা রটিয়েছে আসল ব্যাপার ধামাচাপা দেওয়ার জন্য। প্রাণঘাতী সার্স ও ইবোলা ভাইরাসের জন্যও এই ল্যাবই দায়ী ছিল বলে অনেকে বলে থাকেন।

২০১৫ সালে রেডিও ফ্রি এশিয়া তাদের রিপোর্টে দাবি করেছিল, এই ল্যাবে ভয়ঙ্কর, প্রাণঘাতী সব ভাইরাস নিয়ে গবেষকরা কাজ করেন। জিনের কারসাজিতে এমন ভাইরাস তৈরি করা হচ্ছে যার প্রভাব সাঙ্ঘাতিক। যে দেশের উপর আঘাত হানা হবে, সেখানে মৃত্যুমিছিল শুরু হবে। ‘অরিজিন অব দ্য ফোর্থ ওয়ার্ল্ড ওয়ার’-এর লেখক জে আর নিকিস্টের দাবি, কানাডার ল্যাব থেকে করোনাভাইরাসের নমুনা চুরি করে আনেন উহানের বায়োসেফটি ল্যাবের এক গবেষক। কর্মসূত্রে তিনি কানাডার ওই ল্যাবে যেতেন। তিনিই ভাইরাসের নমুনা উহানের ল্যাবে আনেন। এরপর জিনের বদল ঘটানো হয়। মার্কিন সেনেটর টম কটনের দাবি, চিন জীবাণুযুদ্ধের জন্য ওই ভাইরাস বানিয়েছে। একই দাবি ইজরায়েলের সেনা গোয়েন্দা দফতরের প্রাক্তন প্রধান লেফটেন্যান্ট ড্যানি শোহামেরও। ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের রিপোর্টেও একই দাবি করেছে। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, হয় কোনও ভাবে এখান থেকে অসতর্কতাবশত ভাইরাস বাইরে চলে গিয়েছে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবেই সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার একদল মনে করেন, অন্তর্ঘাতও থাকতে পারে নেপথ্যে।

গত বছর ৩১ ডিসেম্বর প্রথম উহানে নোভেল ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু ইজরায়েলের দাবি, অনেক আগেই এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। উহান নিউমোনিয়া বলে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে গোপনে চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু হু হু করে মানুষ থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তেই টনক নড়ে চিনা প্রশাসনের। কিন্তু ততক্ষণে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরিয়ে গিয়েছে। পরীক্ষায় দেখা যায়, কোনও পশুপাখির বাজার বা সি ফুড মার্কেট থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়নি। এই সংক্রমণের পিছনে অন্য কারণ রয়েছে।

এভাবে একতরফা দোষারোপ মানবে কেন চিন? সম্প্রতি চিনা বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান টুইটারে পোস্ট করে লেখেন, মার্কিন সেনাদের থেকেই প্রথম করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে উহানে। তারপরেই তা ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। গত বছর অক্টোবরে উহানে আয়োজিত সপ্তম মিলিটারি ওয়ার্ল্ড গেমে প্রায় তিনশো মার্কিন সেনা অংশ নেন। তখন তাঁদের কয়েকজন ফ্লু-তে আক্রান্ত হন। পরে কয়েকজনের মৃত্যুও ঘটে। আসলে তাঁরা সকলেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। প্রতিবাদ জানিয়ে মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এর ডিরেক্টর রবার্ট রেডফিল্ড জানান, মার্কিন সেনাদের রক্তে মারণ ভাইরাসের জীবাণু মিলেছিল এটা ঠিক। চিনের পাল্টা বক্তব্য, আমেরিকা মারণ ভাইরাসের কথা স্বীকার করে নিয়েছে মানেই সত্যিটা কি বোঝা যাচ্ছে!

আমেরিকা প্রথম থেকে নভেল করোনা ভাইরাসকে ‘উহান ভাইরাস’ বলে আসছে। যা নিয়ে আগেই আপত্তি জানিয়েছে চিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ড ডোনাল্ড ট্রাম্প নভেল করোনাভাইরাসকে বলছেন ‘ফরেন ভাইরাস’। শুল্ক নিয়ে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধের মাঝেই নভেল করোনাভাইরাসের আবির্ভাব। তারপর থেকেই বিশ্বজুড়ে টালমাটাল পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতি কাজে লাগাতে উঠেপড়ে লেগেছে দুই দেশ। আমেরিকা বলছে, যে বা যারা এই ভাইরাস ছেড়েছে তারা ছাড় পাবে না। ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে তারা। এই সুযোগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চিন নানান মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পিছনে কি আমেরিকাকে পিছনে ফেলে ইউরোপের বন্ধু হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল?

সময় হয়তো অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেবে। তবে যেটা কোনও দিনই জানা যাবে না, সেটা হল নভেল করোনা ভাইরাসের আসল উৎসস্থল কি ছিল। যুগ যুগ ধরে চলবে শুধু এমন দোষারোপের পালা। কারণ, এই মহামারীর দায় কোনও দেশই কখনও নিতে চাইবে না। আর, ফিরবে না নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হারিয়ে যাওয়া হাজার হাজার মহামূল্যবান প্রাণ।

aamarvlog

শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। আমার ব্লগ- হাবি জাবি নয়। যোগাযোগ- ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ- 9434312482 ই-মেইল- [email protected]

Feedback is highly appreciated...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: