আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটিও সাবস্ক্রাইব করে রাখুন বিভিন্ন আপডেট পাওয়ার জন্য।

‘‘রাঢ় বঙ্গের গাজন, আর্য ও অনার্য রীতির মেল বন্ধন’’…লিখছেন মানু গৌতম

ঐতিহাসিকদের মতে শিব বৈদিক দেবতা নন, বেদের যুগের আগেই অনার্যদের মধ্যে শিবঠাকুরের পুজো ব্যাপক ভাবে ছিল। অনেকের মতে, হরপ্পা সভ্যতা থেকে পাওয়া ধ্যানরত পশুপতি মূর্তিকেই শিবের আদি রূপ বলা হয়। বাস্তবেও দেখা যায়, শিব গাজনের পুজোর পদ্ধতি আসলে আর্য ও অনার্য রীতির মিশ্রণ।

শিবের যে প্রণাম পদ্ধতি যাকে রাঢ় বাংলায় প্রণাম খাটা বলে তা আর্যদের সাথে মেশে না। আর্যরা হাঁটু মুড়ে, গড় হয়ে বসে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে, বিশেষ যোগ আসনে বা সাষ্টঙ্গে প্রণাম করেন। কিন্তু শিবের গাজনের ভক্তগণ সমবেত ভাবে দাঁড়িয়ে মাথাটা একটু নিচু করে বাজনার তালে তালে আন্দোলিত করে, যা দেখে ইঙ্গ অষ্ট্রিক শ্রেনীর মানুষের নাচের কথা মনে আসে। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরানের (৬৪৪৫৪৯) মন্ত্রে, শিব উমাকে বলেছেন, (মম যঞ্জে যে নরা পশুপধাপক তে নরা নরকা যান্তে যাবৎ চন্দ্র সূর্য দিবাকরম)
তাই বৈদিক শিব পুজোয় বলিদান শাস্ত্র বিরুদ্ধ। কিন্তু গাজনের সময় ছাগ বলি দেওয়া হয়। তাই বলাই যায় শিবের গাজন অনার্য ও আর্য রীতির এক মেল বন্ধন।

আসলে শিব পুজোর জনপ্রিয়তা দেখে মুনি ঋষিরা শিবের বৈদিকীকরণ ঘটিয়েছেন। তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে গাজনে যে সব নিয়ম কানুন পালন করা হয় তা শরীরের পক্ষে লাভজনক হয়। তাই ঐতিহাসিক ভি আর রামচন্দ্রের সাথে এক মত হয়ে বলতেই হবে, শাক্ত ধর্ম হলো একটা জীবনবাদী হিন্দু ধর্ম।

সনাতনী ধর্মের সমস্ত আরক গ্রন্থেই শিবের উল্লেখ আছে। ঋকবেদ (২/৩৩/,৪,৬,৭) মন্ত্রে শিবকে রুদ্র ও ঋষভ বলে বর্ণনা করা হয়েছে এবং ঋকবেদ (৭/৯/১২) মন্ত্রে ত্রম্বক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জ্ঞানসংহিতায় রুদ্রের সাথে ব্রহ্ম বলেও উল্লেখ আছে।শেতাশ্বতোর উপনিষদে শিবের সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

শিবকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধ্বংসের দেবতা বলে দেখানো হয়েছে। শিবের বারোটি রূপের বর্ণনা পাওয়া যায় তাই দ্বাদশ ভৈরব বলে। শিব বৈদিক দেবতা হিসাবেও সর্ব্বোচ্চ স্থান পেয়েছেন। শিব, সদাশিব, সোমনাথ, রুদ্র ত্রম্বক, মৃত্যুঞ্জয়, ভৈরব, মহাকাল ভৈরব, উন্মত্ত ভৈরব, বটুক পুত্র ভৈরব ইত্যাদি শিবের বিশেষ কিছু নাম। যে কোনও শক্তি পীঠ বা সতী পীঠের কয়েক মাইলের মধ্যেই একটা করে ভৈরব পীঠ থাকবেই। যেমন, নলহাটি বা তারাপীঠের ভৈরব পীঠ হলো বক্রেশ্বর। অট্টহাস সতী পীঠের ভৈরব পীঠ হল বিল্লেশ্বর ইত্যাদি। যাই হোক আর্য অনার্যদের মেলবন্ধন রাঢ় বঙ্গের গাজনের রীতিগুলি এবার দেখা যাক।

রাঢ় বঙ্গে গাজন একটা গুরুত্ব পূর্ণ অংশ। এই গাজন সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয়। গাজন শিব ঠাকুর কেন্দ্রিক। অনুমান করা হয়, এই প্রথা অনার্য, কালক্রমে সনাতনী ধর্মে অঙ্গীভূত হয়েছে। বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসেও গাজন হয়। তবে শিবের গাজন নয়, সেগুলি হয় মনসা, ধর্মরাজ ইত্যাদি ঠাকুরের এবং গাজনের সন্নাসীদের মধ্যেও অন্তজ শ্রেণীর লোকের প্রাধান্য দেখা যায়। রাঢ়বঙ্গে প্রবাহমান কাল ধরেই এই রীতি চলে আসছে।

গাজনের নিয়ম: চৈত্র মাসের ২৬ তারিখে যাঁরা ভক্ত বা সন্নাসী হবেন তাঁরা নিরামিষ আহার করে নিজেকে শুদ্ধাচরণ করেন। একে বলে বার করা। তারপর দিন নির্দিষ্ট পুকুরে অর্থাৎ যে পুকুর হিন্দু রীতিতে সংস্কার করা আছে সেই পুকুরে বা কোনও নদীতে বা গঙ্গায় গিয়ে শুদ্ধাচার করে গেরুয়া বস্ত্র বা সাদা বস্ত্র পরিধান করেন এবং আবক্ষ জলে দাঁড়িয়ে বলেন, “নিজ গোত্র পরিত্যাজ্য শিব গোত্র শিরোধার্য “। তার পর তাঁকে উত্তরীয় দেওয়া হয় এবং বেতের লাঠি দেওয়া হয়। এর পর তাঁর জীবন শুরু হয় শিব কেন্দ্রিক। প্রতিদিন নিয়ম করে তিন বার শিবঠাকুরের সামনে প্রণাম খাটতে হয়, বাড়ির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন থাকে, আশ্রয় হয় গাজন তলা এবং ঐ দিন এক পাকে রাধা অন্ন এক আসনে বসে সেবা করতে হয়। ঐ সময় কারো সাথে কথা বলা বা কারো কথা শোনা নিষিদ্ধ থাকে ,রাত্রের বেলায় শুরু হয় বোলান গান ,যদিও শিবের গানকে অষ্টক বলে ,বোলান কিন্তু শিব সম্পর্কিত হবেই তার কোন বাঁধা রীতি নেই। অন্তজ শ্রেনীর মানুষেরা দল বেঁধে গান করেন ও নাচেন ,ছেলেরাই মেয়ে সাজে ,এবং কখনো কখনো নির্দিষ্ট গল্পের ভিত্তিতে গান করেন একে বলে পালা। এই গল্পগুলি সাধারণত ইতিহাস বা ধর্মের কোন ঘটনার বর্ণনা থাকে । তার পর হয় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনা বা ব্যবস্থার পক্ষে বা বিপক্ষে গান, একে বলে পাঁচালী ,এবং আরো এক ধরনের দ্রুত লয়ের গান একক শিল্পী করে থাকেন তাকে বলে হাবু ,এবং দু এক জন নিজেদেরকে কিম্ভুতকিমাকার করে সাজিয়ে ,অবিন্যস্ত ভাবে কিছু কথা ও নাচ করেন একে বলে সং সাজা।

এর পরের দিন সন্নাসীদের চলে গ্রাম পরিক্রমা ,অন্তত পাঁচটি গ্রাম পরিক্রমা করতে হবে এবং তিনটি গাজন তলায় প্রণাম খাটতে হবে ,এটা একদিকে সকল দেবতাকে ভক্তি প্রদর্শন করা ও ভিক্ষা চাওয়া বলা যায় ,সারাদিন যে ফল ভিক্ষা পান সেগুলি দিয়েই পেট চালাতে হয় এবং রাত্রে হব্যিষান্ন করেন। সব ক্ষেত্রেই কিন্তু শিব ঠাকুরকে মাথায় করে নিয়ে যেতে হবে ,এবং মানুষের মতোই তাকে স্নান করানো ও ভোগ রাঁধার ব্যবস্থা করতে হবে ,তার পর দিন নীলের উপবাস ,সারা দিন নারাম্ভু উপবাস চলবে সাথে শিবের প্রতিনিধি হিসাবে একটি ষাঁড় নিয়ে গ্রামের প্রতি বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে বেড়াতে হবে ,প্রতি গৃহস্থ তখন যে হেতু শিবের প্রতিনিধি বাড়ি এসেছেন তাই শুদ্ধ মনেনে বাড়িতে আসন পেতে ঐ ষাঁড়টিকে স্থাপন করেন ,যার পোষাকী নাম বানেশ্বর ,এবং তাকে তেল সিন্দুর মাখিয়ে স্নানের ব্যবস্থা করে সাধ্য মতো ফল দান করেন ,এবং কিছু টাকা ও চাল ভিক্ষা হিসাবে দান করেন। কথিত আছে ঐ দিন সন্নাসীর বেতের আঘাত গ্রহন করলে অপুত্র মহিলার পুত্র লাভ হয় ,ও গাছে আঘাত করলে গাছ পুষ্পবতী হয়ে ফল দেয়। এবং বাড়ির সর্ব্বাঙ্গীন কল্যান সাধন করে ।

ঐ দিন শুরু হয় বান ফোঁড়া ,এই বান ও বিভিন্ন ধরনের হয় কোনটা সাপের মতো তাকে নাগ বান ,কোনটা বজ্রের প্রতিকৃতি ,তাকে বজ্র বান ,আবার শরীরের কোথায় ফোঁড়া হচ্ছে তার উপরেও বানের নাম নির্ভর করে ,যেমন যে গুলি কোমরে ফোঁড়া হয় সে গুলিকে কোমর বান ,যে গুলি রগে বা কপালের দুপাশে ফোঁড়ে তাকে রগ বান ,যেগুলি জিভে ফোঁড়ে তাকে জিভ বান ,ইত্যাদি ,এই বান ফোঁড়া চলে যেখানে সন্নাসী উত্তরীয় ধারন করেছে সেই পুকুরে ।সেই বান শরীরের নির্দিষ্ট জায়গায় ফুঁড়ে নাচতে নাচতে গাজন তলা পর্যন্ত আসতে হয় ,সব সময় সাথে থাকে ঢ়াক ও কাঁসরের বাজনা ,আর যারা এই বান ফোঁড়ে না তারা অন্য দের সাহায্য করেন ,প্রতিটি বানের অগ্রভাগে তৈরী করা থাকে ফনা বিশিষ্ট নাগ ,সেই নাগকে তেলে ভিজিয়ে দেওয়া নেকড়া জড়িয়ে দিয়ে অগ্নিসংযোগ করে দেওয়া হয় ,এবং সাথে ধুনার গুঁড়ো ছিটানো হয় ,এতে আগুনের ব্যপ্তি ঘটে ,এটা পঞ্চ বান: মদন ,মাদন ,মোহন ,স্তম্ভন ও শোষন কে বশিভূত করনের অনুষ্ঠান বলে অনেকে মনে করেন ,কারন শিব পঞ্চ বানের অধিশ্বর বা বানেশ্বর বলে ঐ দিন পূজা পান।
এই অনুষ্ঠান হলো নিজের শরীরকে বিভিন্ন ভাবে কষ্ট দিয়ে কৃচ্ছ সাধন করা ,এবং নিজেকে শিবের অনুরাগ ভাজন করা।
এই ভাবে বান নিয়ে গাজন তলায় এসে সেই বান খুলে দিয়ে চলবে বাজনার তালে তালে প্রনাম খাটা ,তার পর হবে উন্মত্ত ভৈরবের পূজা ,ও বলীদান ,পূজা শেষে একটি ছাগল শিশুকে শিবের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে তাকে বলিদান করা হয় ,সেই বলীর মাংস সমস্ত শাক্ত বা শৈব্য ব্রাহ্মন বাড়ি পাঠানো হয় ,এই সময় কোন কোন গ্রামে চলে ছাগল শিশুর মুন্ডু অর্থাৎ মাথাটা নিয়ে কাড়াকাড়ি খেলা ,আবার কোথাও চলে নর মুন্ড নিয়ে কাড়াকাড়ি খেলা ,কেউ বলেন মুরকাড়াকাড়ি খেলা কেউ বলেন মুন্ডু নাচ,এর বিশেষত্ব হলো নিজেকে যেহেতু শিবের অনুচর ভাবা হয় তাই পঞ্চভূতের প্রতিটি ভূত নিয়ে উদ্দাম আচরন ,অর্থাৎ পঞ্চ ভূত কে দমনের অনুষ্ঠান। তাই তো বলা হয় চোত পাগলা ।এর পরদিন অর্থাৎ ৩০তারিখে ,শিবের মাথায় ফুলচড়ায় প্রতিটি সন্নাসী ,সেই ফুল শঙ্কুর আকারে চাপানো হয় ,এবং সন্নাসী রা চারিদিকে হাত পেতে বসে এই কদিন ওদের যে একমাত্র ভক্তিরসে আদ্র ধ্বনী ছিলো সেই ধনী বলতে শুরু করেন ,”বলো শিব মহাদেব”যতক্ষন না শিবের মাথা থেকে একটি ফুল পড়ছে ততক্ষন এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে ,ফুল পড়ার পর , পূর্বদিন থেকে চলে আসা নীলের উপবাস ভঙ্গ করেন ফলাহারের মাধ্যমে ,এই দিন ইচ্ছা করলে একপাক অন্ন গ্রহন করতে পারেন ,বা ঠাকুরের ভোগ প্রসাদ গ্রহন করতে পারেন।ঐদিন তার পর প্রনাম খাটা ও ভক্তি অর্চনা করেই কাটে ,
এর পর দিন ভোরের বেলায় শিবঠাকুকে নিয়ে গ্রাম পরিক্রমায় বের হতে হবে ,শেষে ফিরে এসে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাস্তার উপর আগুন জ্বালিয়ে তার উপর দিয়ে হাঁটতে হয় , অর্থাৎ শুচিতার সর্ব্বোচ্চ পরীক্ষা ,,এই পরীক্ষা দিয়ে ,শুরু হবে চরক অনুষ্ঠান ,এই চরক খুব ভয়ানক এক অনুষ্ঠান ,একটা উঁচু বাঁশের সাথে আর একটা বাঁশ বা এটা কোথাও কোথাও কাঠের স্থায়ী ব্যবস্থা থাকে ,তার পর উপরের বাঁশ বা কাঠ যেটা ঘুরতে সক্ষম ,তার দুই মাথায় দুজন মানুষকে বর্শির জুড়ে দিয়ে ঘোড়ানো হয় ,এক্ষেত্রে শরীরে যে বর্শি বেঁধা আছে তাতে ভর করে শরীরটাকে শূন্যে ঘোরাতে হয়।
এর পর দিন ,সকলে সকলে অন্তধৌতিতে নেমে পড়েন ,অর্থাৎ শরীরে যে উপবাসের ফলে পিত্ত ও গ্যাস জমা হয়েছে সেটা নষ্ট করার অনুষ্ঠান ,ঐ দিন অর্থাৎ ১লা বৈশাখ সকাল থেকেই যে যতটা পারেন কুল দিয়ে তৈরী এক ধরনের সরবৎ খান ,খেতে খুবই সুস্বাদু হয় ,এবং জোলাপের মতো কাজ হয় ,প্রচুর পায়খানা হয় ,পেট পরিষ্কার হয় ,তার পর স্নানের সময় ,প্রনাম খেটে শিবকে সেবায়িতের জিম্মায় দিয়ে ,পুকুরে গিয়ে শিব উত্তরিয় পরিত্যাগ করে গারহস্ত জীবনে ফিরতে হয়।
এই অনুষ্ঠানে যোগ দান করলে সারা বছর শরীর সুস্থ থাকে ,অখন্ড পুর্ণলাভ হয় ,বহু অসুখ থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
এই গাজন এক ভক্তি মিশ্রিত উৎসব ,জাতী ধর্ম নির্বিশেষে সকলে যোগদান করে।
আর এই অনুষ্ঠান যে আর্য অনার্য রিতির মেল বন্ধন যা আজ সমগ্র জাতীর মেল বন্ধনে পরিনত হয়েছে।

By aamarvlog

শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। আমার ব্লগ- হাবি জাবি নয়। যোগাযোগ- ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ- 9434312482 ই-মেইল- [email protected]

Feedback is highly appreciated...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: