পোড়ামাটির দেশে যা…

সপ্তাহান্তে একদিনের জন্য কোথাও ঘুরতে যেতে চান? পোড়ামাটির ঘোড়ার গ্রাম বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ায় ঘুরে আসতে পারেন। সম্প্রতি সেই গ্রাম ঘুরে এসে দুর্গাপুর দর্পণের জন্য ভ্রমণ কথা লিখেছেন দুর্গাপুরের চিকিৎসক…

ডাঃ শর্মিষ্ঠা দাস

ফরাসি ফটোগ্রাফার বন্ধু ওডিল দুর্গাপুরে এসে একবার বলেছিল –কোথায় সেই ঘোড়ার গ্রাম ? সেই যে জিরাফের মতো লম্বা গলা, বাঁশপাতার মতো খাড়া কান! ভারতীয় হস্তশিল্পের লোগো যে ওটাই। বাঁকুড়ার কোন এক অজ গাঁ সারা পৃথিবীতে ভারতীয় হস্তশিল্পের প্রতিনিধিত্ব করছে !

বাঁকুড়া শহর ছাড়িয়ে তালড্যাংরা । কিছু পথ এগোলেই শহুরে গন্ধ মুছে যাবে–নিঝুম পুকুর পাড়, বুনো ঝোপঝাড়, মাছরাঙা বসা মরা ডাল জলে ঝুঁকে পড়েছে । তারপর ছোট ছোট কাঁচা পাকা বাড়ি, সরু সরু রাস্তা নিয়ে সেই গ্রাম। পাঁচমুড়া। খাতড়া মহকুমা।

গ্রামে থাকে আশি ঘর কুম্ভকার। সেই যে–যাঁরা নাকি খোদ বিশ্বকর্মার বংশধর। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের কথা। বিশ্বকর্মা শাপভ্রষ্ট হয়ে জন্মালেন পৃথিবীতে এক বামুনের ঘরে আর অপ্সরা ঘৃতাচী হলেন গোপকন্যা। সে যুগে হত এসব–স্বর্গ মর্ত্যে হামেশাই যাতায়াত চলত। বিশ্বকর্মা আর ঘৃতাচীর বিয়ে হল আর নয় পুত্র জন্মাল। পুরাণ মতে এই ন’পুত্রের বংশধর পৃথিবীর ন’টি শিল্পী সম্প্রদায়–মালাকার , কর্মকার, শাঁখারি, তন্তুবায়, কুম্ভকার, সূত্রধর, চিত্রকর, স্বর্ণকার ও কাংসকার । পাঁচমুড়ার লোকজন আবার বিশ্বাস করেন–শিবের জটা থেকে কুম্ভকার সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। শিবঠাকুর যে তাদের লোকসংস্কৃতিতে ভীষণভাবে জড়িয়ে আছেন।

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলটিও সাবস্ক্রাইব করে রাখুন বিভিন্ন আপডেট পাওয়ার জন্য।

পুরো বোশেখ মাস কুমোরের চাক ঘোরে না। সব কাজ বন্ধ থাকে একমাস। কেন জানো না ? ওই যে, শিবঠাকুর একদিন চত্তির মাসের রোদে কাহিল হয়ে এসে কুমোরের চাকের উপর বসলেন একটু জিরোতে–জায়গাটা বেশ ঠান্ডা তো! এবার শিবঠাকুরকে তো আর উঠতে বলা যায় না। ঠাকুর ওখানে বসেই রইলেন টানা একমাস। “জষ্টি মাসের পেত্থম বিজোড় শনিবার উপোস করে, পুজো টুজো করে, চাল কলা বিড়ি কলাই নৈবিদ্যি দিয়ে তবে শিবঠাকুরের ভাসান হয় ” –বলেন কুম্ভকার দিদি বোনরা। তারপর আবার চাক ঘোরে।

ঘরে ঘরে চাক ঘুরছে ঘড় ঘড় –এখানে দুনিয়া ঘোরে ওই কুমোরের চাকাতে। এই চাকা ঘুরলেই তবে, ভাতের হাঁড়িতে উনুনে কড়াইতে হাতা ঘোরে। বন বন বন বন –হাতের আলতো চাপে মাটির তাল হয়ে যায় হাতির শুঁড়, মানুষের মাথা, ঘোড়ার গলা, বাহারি টব আরো কত কি যে। ঢুকতেই ডানদিকে ব্রজনাথ কুম্ভকারের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল–পাঁচজন মিলে ধাই ধপা ধপ ধাই ধপা ধপ মাটির চাদর পিটছে। টেরাকোটা টালির অর্ডার আছে। ইচ্ছে মতো রিলিফের কাজের টেরাকোটা টালির এখন প্রচুর চাহিদা শহরে। হোটেল,রিসর্ট,অফিসের লাউঞ্জে , বাড়ির হলঘরে লম্বা লম্বা দেওয়ালে চিত্রিত টেরাকোটা টালি বসানোর চল হয়েছে। খাদে পড়ে যাওয়া শিল্পীদের বাঁচিয়ে দিয়েছে এই টেরাকোটা ইন্টেরিয়র। নইলে দু’চারটে বাহারি হাতিঘোড়া বিক্রি করে কি সংসার চলে নাকি ? ঘর সাজানোর সামগ্রী লোকে কত আর কেনে !

ব্রজনাথ ভাই এত মাটি কোথা থেকে পান ? যে কোনো মাটি দিয়ে কি টেরাকোটা শিল্প হয় ? হাঁ হাঁ করে ওঠেন শিল্পী । একটা বিশেষ ধরনের এঁটেল মাটি ছাড়া টেরাকোটা শিল্প হয় না । সেই মাটি এখানে শুধু একটা গ্রামেই পাওয়া যায়–পাড়তেঁতুল । পাঁচমুড়া থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে । জমির ছ’ফুট নীচে একটা বিশেষ স্তরের মাটি । মূল্য ধরে দিয়ে কিনে আনতে হয় । সেই মাটি জমিয়ে রাখতে হয় কিছুদিন । তারপর লোহার তার দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে নিতে হবে । চালুনি দিয়ে কাঁকর পাথর বেছে ফেলে দিতে হবে । এবার পরিমাণ মতো বালি মিশিয়ে এঁটেল মাটির আঠালো ভাবটা কমানো হল । পায়ের চাপে চাপে জল দিয়ে মাখা হল বেশ করে । এবার শিল্পীর হাতের কেরামতি । ইউটিউবে, রাজার পদক পাওয়া শিল্পী ভুতনাথ কুম্ভকারের কাজ দেখলেই বুঝতে পারবে । শুধু ভুতনাথ কেন –এ গাঁয়ের সবাই ম্যাজিকের মতো দু মিনিটে হাত ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে –ছিল মাটি হল হাতি !

pix of terakota horse

শিল্প গড়া হলে তাকে কিছুদিন ছায়ায় ঘরের মধ্যে রেখে শুকোতে হবে । তারপর একদিন রোদে শুকোনো । হড়বড় করে শুকোতে গেলেই মাটিতে চিড় ধরে যাবে । রোদে শুকিয়ে গেলে মূর্তির গায়ে রঙ করতে হবে । এ রঙ কিন্তু সে রঙ নয় । মাটি গুলেই রঙ তৈরী হয় । একটু অন্যরকম এঁটেল মাটি হল গিয়ে রঙমাটি । আরতি কুম্ভকার দেখি মাটির পাত্রে নেকড়া চুবিয়ে মাটি গোলা তুলে কাঁচামাটির হাতি, ঘোড়া ,মনসা চালির গায়ে লেপছে । উঠোনে সারি সারি শুকোচ্ছে সব বাহিনী–দেখোরে দেখোরে কত সেনা চলে সমরে ! একদিকে দেখি ওর জা বাসন্তী কড়ায় বালি চাপিয়ে সাদা গোল গোল মুড়ি ভাজছে–নারকেল কাঠির নাড়াচাড়া পটর পট তৃপ্তির শব্দ তুলছে , সামনে বাটি হাতে হাঁটু মুড়ে বসে আছে কুচো কাচা ছেলেমেয়ে–গরম মুড়ি বেগুনপোড়া দিয়ে খাবে । মুড়ি ভাজা হলে আঁচলে হাত মুছে বাসন্তী যাবে স্বামীর জন্য কাদা ঠাসতে । স্বামীর চাক ঘুরছে উঠোনের এক পাশে । উঠোনের অন্য কোণে বড় হাঁড়িতে টগবগিয়ে ফুটছে ভাত — বাস্তবিকই কি সম্পর্কযুক্ত তারা! এজমালি এক উঠোন ঘিরে সবার ঘর । সন্ধ্যা কুম্ভকার লাল মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে মাটি ছেনে কিছু কবিতার অক্ষর লিখছেন। পাশে খাট বিছানা । নাতি নাতনিরা গলা জড়িয়ে দোল খাচ্ছে–শিল্পীর কোনো বিরক্তি নেই । শান্ত নির্বিকার জীবন । ঘর গেরস্থালি আর শিল্প–জীবন আর জীবিকা –দুটো চাকা যেন অনন্তকাল ধরে এমনি মৃদুলয়ে চলেছে ।

আরও পড়ুন- একদিনের জন্য ঘরের পাশে ক্ষীরগ্রাম থেকে ঘুরে আসুন

আরতি দিদি এবার নিয়ে গেল ভাঁটি দেখতে । চাকা আর ভাঁটি পোড়ামাটির কাজের দুই পিলার । এক রাক্ষুসে উনুন । লাফ দিয়ে গর্তে নামতে হয় । ডাঁই করা শুকনো পাতা কাঠ রাখা আছে এক পাশে । জ্বালানি । উনুনে গুঁজে আগুন জ্বালানো হবে । ডোকরার কাজে ধাতু গলবে বলে ভাঁটির তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি হওয়া প্রয়োজন। এখানে উল্টো–নরম মৃদু আঁচে পাঁচ ছ’ঘন্টা ধরে পুড়বে । তাপমাত্রা বেশী হলে মাটি ফেটে যাবে । দূর দূর সব জায়গায় পাড়ি দিতে হবে তো । শক্তপোক্ত হল , লাল রঙ ধরল । ভাঁটির ওপর কাঁচামাটির শুকনো শিল্প সামগ্রী সব বিছিয়ে দেওয়া হয় । উপরে ঢাকা দেওয়া হল । কালো রঙের টেরাকোটা চাইলে ঘুঁটের আঁচ আর ধোঁয়া বেরোনোর সব পথ গুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় –কার্বন আর ধোঁয়া মিলে কালো ঘোড়া হয়ে গেল । আরতি ভাঁটি থেকে চার জোড়া ঘোড়া আর হাতি দিল । অবিশ্বাস্য কম দাম । বারো টাকায় একটা ভালো লেবেঞ্চুসও হবে না ! বিক্রিবাটা , আর ভাত রান্না একইসঙ্গে চলছে । আঁচলের খুঁটে একেই বলে নারীশক্তি ! কুটিরশিল্প নামও বোধহয় এজন্যই ।

বড় মাপের টেরাকোটা শিল্পীরা নিজেদের কাজ বদলে ফেলেছেন –আধুনিক বিষয় ভাবনার প্রতিফলন , আধুনিক চাহিদা অনুযায়ী কাজ করছেন । মাটির ল্যাম্পশেড থেকে দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ে আলোর লতাপাতা । মঙ্গল শঙ্খে ফুঁ পড়ে । কাপ ডিস, দুর্গাঠাকুর, পেঁচা –বড় কুমোরের ঘরের বিপণিতে কি নেই ! শহুরে চাহিদা অনুযায়ী পোড়ামাটির গয়নার উপরেও লাগছে অন্য রঙের প্রলেপ । কোনোদিন এই ঘোড়ার জিন হাতির হাওদাও যদি রঙিন হয়ে যায় সে বড় কষ্টের কথা হবে—এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে টেরাকোটা গ্রামের সীমানা পেরিয়ে আসি…।

ছবি-লেখক।

aamarvlog

শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, রান্না সহ আরও নানা কিছু। আমার ব্লগ- হাবি জাবি নয়। যোগাযোগ- ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ- 9434312482 ই-মেইল- [email protected]

Feedback is highly appreciated...

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: